পুরীর মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক হারানো নগরী - খোঁজ মিলল গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার এর ইমেজিং-এ।
-------
আমাদের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ দেব, সুভদ্রা ও বলরামের মূর্তি রঙ করাতে গেছিলাম পুরী। এনারা আমাদের বাড়িতে পনের বছর আগে এসেছিলেন অলৌকিক ভাবে। রাজার বাগানের নিম-কাঠের তৈরি দারুব্রহ্ম। এতদিন ধরে স্নান-পুজোর ফলে রঙ অনেকটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই মূর্তি আবার রঙ করার অধিকারী সবাই নয়, পুরীর বিশেষ কয়েকজন-ই সেটা করতে পারেন। তাই পুরী যাত্রা, ওঁনাদের কোলে নিয়ে। আদেশ এসেছিল। সেও এক অনন্য অলৌকিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু আজ নয়, সে গল্প নাহয় অন্য একদিন হবে।
জানতাম না, বাড়ি ফেরার পরদিনই এমন একটা খবর পাব যা আমাকে চমকে দেবে।
পুরীর মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এক হাজার বছরের পুরনো একটি পুরো নগরী। না, এটা কোনো গল্প বা কিংবদন্তি নয়। IIT গান্ধীনগরের GPR (Ground Penetrating Radar) সমীক্ষার রিপোর্টই এ কথা বলছে।
কীভাবে জানা গেল?
২০২২ সালে শ্রীমন্দির পরিক্রমা প্রকল্পের খননকার্যে মাটির নিচে পাওয়া যায় একটি ভাঙা সিংহ মূর্তি, একটি ৩০ ফুট দীর্ঘ প্রাচীর এবং একটি প্রাচীন কক্ষ। সবই গঙ্গা রাজবংশের আমলের। এরপর সরকার ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে IIT গান্ধীনগরকে দিয়ে পুরো এলাকার GPR সমীক্ষা করায়। কিন্তু সেই রিপোর্ট বছরের পর বছর চাপা পড়ে থাকে। অবশেষে আইনজীবী দিলীপ বারাল RTI দায়ের করে সেটি প্রকাশ্যে আনেন মাত্র কয়েকদিন আগে, মার্চ ২০২৬-এ।
কী পাওয়া গেছে?
রিপোর্ট পড়লে গায়ে কাঁটা দেয়। মাটির মাত্র ২-৩ মিটার নিচে চাপা পড়ে আছে;
- ৪৩টি সম্ভাব্য ঐতিহ্যবাহী স্থান! এমার মঠ, নৃসিংহ মন্দির, বুঢ়ি-মা মন্দির সহ জগন্নাথ মন্দিরের চারপাশ জুড়ে।
- ১৮টি ভূগর্ভস্থ নির্মাণ, পুরোপুরি অক্ষত!
- একটি বিশাল সুড়ঙ্গ, জগন্নাথ মন্দির থেকে সরাসরি বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত বলে মনে করা হচ্ছে। মন্দিরের নিচের চেম্বার - যার দরজা খুললেই ভয়ানক গর্জনের শব্দ পাওয়া যায় - আর যাকে বাসুকির গর্জন বলা হত, সেটা কি সমুদ্রের আওয়াজ - আর ওই গুপ্ত কক্ষ কি সেই টানেলের গেট? কে জানে?
- সোনা বা রুপার ইটের মতো ধাতব বস্তু, বিশেষত নৃসিংহ মন্দিরের কাছে।
মন্দিরের বাইরের প্রাচীর থেকে ৭৫ মিটার ব্যাসার্ধ পর্যন্ত প্রাচীন বসতির ছাপ মিলছে।
এবার বলি - আমি কেন এতটা আপ্লুত?
কদিন আগে যে রাস্তায় হেঁটেছি, যে মাটিতে পা রেখেছি - সেই মাটির তলায় হয়তো ঘুমিয়ে আছে হাজার বছর আগের এক জীবন্ত শহর। পূর্ব গঙ্গা রাজবংশের সময়কার মানুষের হাসি, কান্না, পূজা, বাণিজ্য, সবকিছু। জগন্নাথ ধাম শুধু ভক্তিকেন্দ্র নয়, এ যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।
এখন সরকারকে এগিয়ে আসতেই হবে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণকারীরা সতর্ক করে দিয়েছেন - মডার্ন কনস্ট্রাকশন চলতে থাকলে এই অমূল্য ইতিহাস চিরতরে নষ্ট হয়ে যাবে। ওডিশা সরকারকে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য শুরু করতে হবে এবং সম্পূর্ণ রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। ভয় একটাই - নানা কায়েমী স্বার্থে যেন না এ অমূল্য রত্ন চাপা পড়ে থাকে!
জগন্নাথ দেবের এই ধামে আবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে - এবার শুধু দর্শনার্থী হিসেবে নয়, একজন ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে।
⭕❗⭕
জয় জগন্নাথ!